বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর ছাত্রদলের ‘হামলার’ প্রতিবাদ শিবিরের অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ডের প্রশ্নে উত্তপ্ত সেই ভাইরাল ভিডিও, বাস্তবে কী ঘটেছিল? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একজন হারালেন চোখ, আরেকজনের মাথায় ৫ সেলাই সাংবাদিক হেনস্তার পর সাদুল্লাপুরের সেই এসিল্যান্ডকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি চট্টগ্রামে গ্রেপ্তারের একদিন পর যুবলীগ নেতার মৃত্যু মসজিদের ভেতর থেকে ইমামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, কক্ষে মিললো চিরকুট আরেক হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো মমতাজকে মেসিকেও ছাড়ালেন রোনালদো, বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ড কবিরহাটে পিকআপভ্যানের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত দুই ৪ বছরের অনার্স চার বছরেই শেষ করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী
সাংবাদিক হেনস্তার পর সাদুল্লাপুরের সেই এসিল্যান্ডকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি

সাংবাদিক হেনস্তার পর সাদুল্লাপুরের সেই এসিল্যান্ডকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে অর্পিত (সরকারি) সম্পত্তি অধিগ্রহণের প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এবং এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অপেশাদার ও হেনস্তামূলক আচরণের ঘটনায় অবশেষে বদলি করা হয়েছে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিনকে। তাকে পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায় বদলি করেছে প্রশাসন।

বুধবার (২৪ জুন) সিনিয়র সহকারী কমিশনার উত্তম কুমার দাশ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ বদলির নির্দেশ জারি করা হয়। বহুল আলোচিত এই ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছিল।

তথ্য চাইতেই সাংবাদিকদের ওপর চড়াও:
গত ১৮ জুন সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট এলাকায় অর্পিত সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে সরকারের প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য নিতে এসিল্যান্ডের কার্যালয়ে যান সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু ও যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মণ্ডল পলাশ।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকদের দেখেই তাদের মোবাইল ফোন জমা রাখতে বলেন এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন। পরে জমি সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে ধমক দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের হাতে থাকা বুম ও ক্যামেরা সরিয়ে দিয়ে বলেন, “এটা কি ফাজলামোর জায়গা?” এবং কার্যালয় থেকে বের হয়ে যেতে নির্দেশ দেন। এরপর দ্রুত সরকারি গাড়িতে করে স্থান ত্যাগ করেন।

ঘটনার ভিডিও ও বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা এবং সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ দেখা দেয়।

সংবাদ প্রকাশের পর তোলপাড়:
১৯ জুন বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে ধাপেরহাটের হাসানপাড়া মৌজার ওই জমি। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, অর্পিত সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করা হয়েছে।

সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সুশীল সমাজ, সাংবাদিক সংগঠন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

বিভাগীয় কমিশনারের তদন্ত:
ঘটনাটি রংপুর বিভাগীয় প্রশাসনের নজরে এলে বিভাগীয় কমিশনার তদন্তের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুন গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আশরাফুল ইসলাম।

তদন্তে সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু, যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মণ্ডল পলাশসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়। যদিও তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

তদন্তের পরই অর্পিত সম্পত্তিতে সাইনবোর্ড:
স্থানীয়দের মতে, তদন্তের ঠিক পরদিনই নতুন করে আলোচনার জন্ম দেন এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষে ২২ জুন তিনি হাসানপাড়া মৌজার বিতর্কিত জমিতে গিয়ে সেটিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যে জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের ভেতরেই পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন রয়েছে, সেই জমি সম্পর্কে এতদিন অবস্থান কী ছিল?

কীভাবে উঠল প্রায় ৩ কোটি টাকা?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় হাসানপাড়া মৌজার ১/১ ও ২৩৭ নম্বর বিআরএস খতিয়ানের অধিগ্রহণকৃত প্রায় সাড়ে ছয় শতক জমির বিপরীতে ২ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩২ টাকা ৭০ পয়সা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অর্থ উত্তোলন করেন পার্শ্ববর্তী পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের সদস্যরা।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল্লাহ ফারুকী দাবি করেন, জমিটি প্রকৃতপক্ষে অর্পিত সম্পত্তি। তিনি জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় লিখিত আপত্তিও জমা দিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

একই জমি নিয়ে দুই বিপরীত প্রতিবেদন:
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অথচ ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল ধাপেরহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে একই জমিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করে সরকারি স্বার্থ জড়িত থাকার কথা বলা হয়।

এই দুই পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েই সাংবাদিকরা এসিল্যান্ডের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন।

ইউএনওর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে:
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২ জুন একই বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনও সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হলে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

পরে ইউএনও মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি ভূমি অফিসের দুই ধরনের প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এখন সবার নজর তদন্ত প্রতিবেদনে:
সাংবাদিক হেনস্তা, সরকারি সম্পত্তি নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকা এবং প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আত্মসাতের অভিযোগে প্রশাসনের বদলির সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—শুধু বদলি নয়, তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং দায়িত্বে অবহেলার ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এখন সেই উত্তর খুঁজছে গাইবান্ধাবাসী।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com